পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু ছাত্র-ছাত্রীকে যেন আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি- শিক্ষারত্ন পুরস্কার প্রাপক জাহাঙ্গীর হোসেন

কলকাতা জেলা পাঠকের কলমে

পাঠকের কলমে, এন এ নিউজ বাংলাঃ আমি মনে করি শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, সমাজের প্রতি শিক্ষকদের দ্বিবিধ দায়বদ্ধতা থাকে, একটি সমাজ সেবা মূলক এবং অন্যটি শিক্ষাদান করা। মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সুস্বাস্থ্য, ও তাদের মান উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের দায়বদ্ধতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ কথা কখনো ভুললে চলবে না যে, শিক্ষকরাই মানব জাতি গড়ে তোলার বিশেষ কারিগর।
আমি দীর্ঘ ত্রিশ বছরের অধিক মাদ্রাসার শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতার মধ্যে কুড়ি বছরের অধিক বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে এবং 10 বছরের অধিক প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি করার সুবাদে বেশকিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। মাদ্রাসায় অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। অধিকাংশ প্রথম প্রজন্ম, বড়জোর দ্বিতীয় প্রজন্মের পড়ুয়া।অভিভাবকদের অধিকাংশ দিনমজুর দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ।অপেক্ষাকৃত দুর্বল মেধা ও সাধারণ মেধা সম্পন্ন ছেলেমেয়েরা মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করে।তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে।মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে 70 শতাংশের অধিক ছাত্রী।এখানে অভিভাবকদের মধ্যে অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। দারিদ্রতার কারণে ছাত্ররা, বেশিরভাগ ছাত্র সম্প্রদায় মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অবিভাবকদের সহযোগিতার জন্য তারা বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। অনেকেই শিশু শ্রমিককে পরিণত হয়, ফলে স্কুল ছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়,দৈনন্দিন হাজিরা কমতে থাকে।এছাড়া ধর্মীয় সংকীর্ণতার শিকার, আধুনিক মানসিকতার অভাব, নানারকম কুসংস্কারের স্বাস্থ্য সচেতনতার অত্যন্ত অভাব লক্ষ্য করা যায়। মাদ্রাসায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবকের স্বল্প শিক্ষা ও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাব সন্তানের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ফলে সামাজিক ও আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় আরো পিছিয়ে পড়ে।সমাজ পিছিয়ে যায় দেশ পিছিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা যারা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করি তাদের বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।এই সকল প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমি মাদ্রাসায় শিক্ষক শিক্ষিকা ছাত্র ছাত্রী মিলে একত্রে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল হয়েছে।যেগুলো আমি সকল মাদ্রাসার শিক্ষক শিক্ষিকা বৃন্দের সঙ্গে আদান-প্রদান করতে চাই এবং অনুরোধ করতে চাই এই সকল উদ্দেশ্য গ্রহণ করার জন্য। যদিও অনেক মাদ্রাসা ইতিমধ্যে যথেষ্ট কার্যকারী উদ্দেশ্য গ্রহণ করেছেন এবং সফল হয়েছেন।
(১) যেমন কোন ছেলে মেয়ে যেন মাদ্রাসায় আঙিনায় বাহিরে না থাকতে পারে তার জন্য নিয়মিত এলাকা পরিদর্শন করে অভিভাবকদের সচেতন করা এবং শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো।
(২) যেমন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়মিত ক্লাসে পাঠদানের সময় বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদ্ধতি অনুসরণ TLM,কম্পিউটার ক্লাস,Low cost,No cost material ব্যাবহার ও ডিজিটাল ক্লাস গ্রহণ(যদি সম্ভব হয়) যথাসম্ভব হাতে-কলমে তা পাঠদানের ব্যবস্থা করা।
(৩) মাদ্রাসায় আকর্ষণীয় মনোরম পরিবেশ তৈরি করা।যেমন- ফুল বাগান,সবজি বাগান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা,দেওয়ালে বিভিন্ন মনীষীদের ছবি ও বাণী মাদ্রাসার বিল্ডিং এর আকর্ষনীয় রং ইত্যাদির মাধ্যমে মাদ্রাসার সৌন্দর্যায়ন বৃদ্ধি ঘটানো।
(৪) বিভিন্ন প্রকার সচেতনতামূলক প্রচার যেমন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ,শিশু পাচার,নারী পাচার, পণপ্রথা, শিশু শ্রমিক ,বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার ,ধর্মীয় সংকীর্ণতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা,সেমিনার গঠন করা।
(৫) বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞান মেলার আয়োজন।
(৬) প্রতিবছর শিক্ষামূলক ভ্রমণের আয়োজন।
(৭) মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ।
(৮) মেয়েদের আত্মরক্ষার পাঠ দেওয়ার জন্য ক্যারাটে প্রশিক্ষণ (যদি সম্ভব হয়)।
(৯) নিয়মিত খেলাধুলা ,শরীর চর্চার ব্যবস্থা, মাল্টি জিম (যদি থাকে) এর ব্যবহার।
(১০) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন।
★ এ ছাড়া পরিকাঠামো উন্নয়ন বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটেশন, মিড-ডে-মিল ইত্যাদি বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা।
★স্বাস্থ্য সচেতনামূলক প্রচার ডেঙ্গু ,ম্যালেরিয়া, হাম কুষ্ঠ ,থ্যালাসেমিয়া ইত্যাদি বিষয়ে।
আমার বিশ্বাস উপরিক্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ইতিমধ্যে অনেক মাদ্রাসা গ্রহণ করেছে। যেসব মাদ্রাসা এখনো এই সকল কর্মসূচির বাইরে আছে তারাও যদি উদ্যোগ নেন আশা করি সফল হবেন। মাদ্রাসায় আসার প্রতি আকর্ষণ বাড়বে,মাদ্রাসায় আঙিনার বাইরে থাকার প্রবণতা কমবে,দৈনন্দিন হাজিরা বৃদ্ধি পাবে স্কুলছুট কমবে।
আমরা উল্লেখিত দৃষ্টিভঙ্গি গুলি কে হাতিয়ার করে আমাদের প্রধান লক্ষ্যমাত্রা গুলিকে স্পর্শ করতে পারি।পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে উন্নয়নের কান্ডারী করে সমাজকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

লেখক- প্রধান শিক্ষক (শিক্ষারত্ন প্রাপ্ত),আরিজিল্লাপুর সিদ্দিকিয়া হাই মাদ্রাসা(উ: মা:),দেগঙ্গা, উত্তর ২৪ পরগনা